সংস্কৃতি মানুষকে পরিবর্তন করে, না মানুষ সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করে, এ নিয়ে
ব্যাপক ধোঁয়াশা থাকলেও। এ কথা সবাই মানতে বাধ্য মানুষ এবং সংস্কৃতি সহ অবস্থান করে।
সে ক্ষেত্রে সংস্কৃতি মানুষের উপর কতক প্রভাব ফেলতে পারে, আবার মানুষ সংস্কৃতির উপর
প্রভাব ফেলতে পারে। ছোট বেলায় আমাদের এক টিচার সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন
যে, সংস্কৃতি হল অনেকটা পেত্নীর মত গাড়ে উঠলে আর নামতে চায় না। এবেলায় পেত্নী আর সংস্কৃতির
পার্থক্য বুঝতে পেরেও কেন যেন মনে হচ্ছে স্যার বোধয় কিছু একটা জায়গায় ঠিকই বলেছেন।
কারণ বিশ্বায়নের ফলে সংস্কৃতির নামে পাশ্চাত্য-মুখী পুঁজিবাদী, নব্য টেকনোরেশনাল যে
আইডিওলজি বাংলার ‘সুবোধ”, “হাবা-গোবা” মানুষের উপর ভর করেছে, তাকে পেত্নী না বলে পারা যায় না। এসব পেত্নীদের
বিরক্ত করার জন্য কিছু ওঝা মহল নানা ভাবে সুড়সুড়ি (তদবির) দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই সুড়সুড়িতে
ঝিমিয়ে থাকা পেত্নীদের কি’বা করা যেতে পারে ? সর্বোচ্চ জাগিয়ে তোলা যেতে পারে।
এ কদিন ফেইসবুকে সংস্কৃতির বার্তা শুনে শুনে কান জ্বালা-পালা হয়ে গেছে।
ভ্যালেন্টাইন ডে, কিস ডে, গাঁজাখুরী ডে, ১লা বসন্তও। এই দিবসগুলোর এতো সমালোচনা শুনেছি
যে খানিকক্ষণের জন্য নিজেকে কুম্ভকর্ণ ভেবেও আনন্দ পেতাম। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধান
কেউই দিতে চেষ্টা করেনি। বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। কথাটা ঠুমকো মনে হলেও
এর প্রভাব যে সর্বত্র বিরাজমান তা বলা বাহুল্য। বিজ্ঞান এবং আধুনিক টেকনোলজির প্রভাবে
এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশে খুব সহজেই প্রবেশ করে। তাছাড়াও নব্য কলোনিয়ালিজমের যুগে
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা এমন ভাবে সাজানো হয় যাতে শিক্ষার্থীরা পাশ্চাত্য
সংস্কৃতির কাছে নতজানু হয় এবং এই সংস্কৃতিকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে। আমাদের দেশের দিকে তাকালেই
তা স্পষ্ট বুঝা যাবে। এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে একটা ছাত্র অবশেষে কোট
টাই পরা দাস হিসেবে বেরোয়। এ যেন বহুজাতিক কোম্পানির দাস বানানোর ফ্যাক্টরি (কারখানা)।
শিক্ষা কাঠামোর ধাপগুলো যে যত বেশি সাফল্যের সাথে পার করেছে, সে যেন আরও নিখুঁত দাস
হিসেবে গড়ে উঠেছে। তো এই বুদ্ধিভিত্তিক দাসগুলোর সাংস্কৃতিক দৈন্যতা আর তুলে ধরতে হবে
না।
বিজাতীয় সংস্কৃতি হটাতে এখন একটাই সমাধান দেশীয় সংস্কৃতিকে সবার সামনে তুলে
ধরতে হবে। পরিশুদ্ধ সংস্কৃতি তৈরি করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পহেলা বৈশাখ,
পহেলা ফাল্গুন, ভাষা আন্দোলন, বিজয় দিবস থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোর
মাহাত্ম্য সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। হলিউড, বলিউড, কালি-উডের সাংস্কৃতিকে আগ্রাসন
ঠেকাতে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে সুপরিকল্পিত ভাবে সাজাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হল সবার মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। ধর্ম মানুষকে সংস্কৃতিবান করে। ভেলেন্টাইন্স
ডে, 31st নাইটের মতো বিজাতীয় সংস্কৃতি দূর করতে হলে দেশীয় সংস্কৃতিকে আরও স্ট্রং করতে
হবে। সংস্কৃতিকে পুঁজিবাদীয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এবং দেশের জনগণকে পাশ্চাত্য
মুখিতা, দাসবৃত্তিয় মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশীয় সংস্কৃতি বিজাতীয় সংস্কৃতি
দ্বারা ডাকা পড়বে না। বাঙলা সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে হাজার বছর।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন